Donald J. Trump এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট আশা করি আমরা সকলে ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছি। যেখানে উনি বলেন,
''Iran is looking at freedom, perhaps like never before. The United States of America stands ready to help!''
(The Arsonist)
আমরা বাংলাদেশে ধরে নিয়েছি যে, আমেরিকা ও ইসরায়েল তবে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো বলে! যেখানে বাস্তবতা আসলে চরম অশুভ!
ইরানের ওপর যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের জন্য আমেরিকার পার্শিয়ান গালফ ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে কমপক্ষে দু'টি Carrier Strike Group (CSG) রাখা দরকার। সেখানে বর্তমানে পার্শিয়ান গালফ তো দূরে থাক, পার্শিয়ান গালফ যে কমব্যাটান্ট কমাণ্ডের অংশ, সেই U.S. Central Command এর সমগ্র Area of Responsibility (AoR) তেই কোনো CSG বর্তমানে মোতায়েন নাই!
ইরানের সর্বাধিক নিকটস্থ CSG বর্তমানে রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। যারা চীনের দিকে আজকের লেখা চলাকালীন সময়ে U.S. Indo-Pacific Command এর AoR এর সাগরে থাকা একমাত্র স্ট্রাঈক গ্রূপ। ফ্ল্যাগশিপ বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে ওখানে আণ্ডারওয়ে থাকা স্ট্রাঈক গ্রূপটিকে বর্তমানে চীনকে ছেড়ে দিয়ে Re-assign করার EXORD দেওয়া হবে বলে যদি ধরেও নিই, তবুও ওদের পার্শিয়ান গালফে পৌঁছাতে কমপক্ষে ১০ দিন দরকার হবে বলে ধরে নেওয়া উচিত। মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর পেরিয়ে যেখানে ওদের তেহরানের রেঞ্জে আসার পূর্বে আনুমানিক ৬,০০০ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে হবে।
President Donald J. Trump এর
"Stands ready to help"
মন্তব্যের পর তাই আমি বৃটেন ও ফ্রান্সের নেভির CSG নিয়েও সামান্য খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। দেখা গেলো যে, ওদের বিমানবাহী রণতরীগুলিও বর্তমানে নিজ নিজ দেশের বন্দরে পার্ক করা রয়েছে।
কথা হলো, স্ট্রাঈক গ্রূপ ছাড়া আমেরিকা তেহরানে কিছু করতে সক্ষম কিনা। তার উত্তর হলো, সক্ষম। কিন্তু, সেটি হয়তো খুব কার্যকর বা শক্তিশালী কিছু হবে না। বিপরীতে যখন ইরান থেকে লঞ্চ শুরু হবে, তখন ইরানি লঞ্চ থামানোর জন্য ভূমধ্যসাগর ও পার্শিয়ান গালফ অঞ্চলে U.S. Navy এর যথেষ্ট পরিমাণ Air Defence Destroyer বর্তমানে ডেপ্লয়েড নাই। পার্শিয়ান গালফ ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে বর্তমানে নেভির ফিফথ ফ্লিটের ০৫টি Aegis Destroyer মোতায়েন আছে। যেখানে গত '২৫ সালের জুন মাসের সংঘাতের সময়ে সংখ্যাটি ছিল ১২। ফলে, سپاه پاسداران انقلاب اسلامی কর্তৃক ইসরায়েল ও আশপাশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর বিধ্বংসী হামলা শুরু হলে (অস্তিত্বের হুমকি থাকার কারণে যা স্বাভাবিক হিসাবে পূর্বের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হওয়ার কথা) তা থামাবার জন্যও যথেষ্ট রণতরী সেখানে মোতায়েন নাই।
তবে, ওসবের তোয়াক্কা না করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি United States Air Force এর সহায়তায় তবুও হামলা চালাতে পারেন। সেক্ষেত্রে উনি ইরান প্রতি-আক্রমণ চালিয়ে তেমন ক্ষয়-ক্ষতি করতে পারবে না মর্মে কোনোভাবে নিশ্চিত হয়েই চালাবেন বলে অনুমান করা যায়। যদিও, সে নিশ্চয়তা আসলে দেখতে কেমন তা বর্তমানে আমি বলতে অসমর্থ।
তাহলে, মার্কিন রাষ্ট্রপতির "America stands ready to help" এর অর্থ দাঁড়ায় অনেকখানি ভিন্ন। ইরানে বর্তমানে যে আন্দোলন হচ্ছে, সেখানে তেহরানের সিকিঊরিটি অ্যাপারাটাস প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে তা দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এমতাবস্থায় যার ফলে মানুষ ওখানে আরো বেশি করে আন্দোলনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে Paradox of Repression। যেখানে মানুষ 'Now or Never' মানসিকতা নিয়ে নিয়মিত আরো বেশি সংখ্যায় জড়ো হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি যা করছে তা হলো External Signaling। যেখানে চরম দমন-পীড়নের মুখে তার বার্তা ইরানিদের মনোবল ধরে রাখার রসদ জোগাচ্ছে। তবে, আমার ধারণা হলো, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কমিঊনিটি আসলে এখানে যা করছে, সেটা হলো, ওরা ইরানকে বিকল করে ফেলার পদক্ষেপ অবলম্বন করেছে। এখানে আমেরিকানদের কর্মকাণ্ডকে আমরা Strategic Provocation, Subversion, Managed Instability এর মতো শব্দে ব্যাখ্যা করতে পারি। যেখানে আমেরিকানরা সরাসরি শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ইরানিদের উদ্দেশ্য নিজেরা হাসিল করে দিতে রাজি নয়। নিজেদের ইরাকের মতো আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে নিতে তৈরি নয়। অন্তত এখনো নয়। বরঞ্চ, ইরানিদের উসকে দিয়ে ওরা হয়তো ওদের এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে ঠেলে দিতে চায়, যেখান হতে ইরানি আন্দোলনকারীরা আর ফেরত আসার সুযোগ পাবে না। ওদের তখন নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। আর NATO Intelligence Community তখন ক্ল্যাণ্ডেস্টাইন সাপোর্টের দ্বারা পরিস্থিতিটিকে স্থায়ী করার চেষ্টা চালাবে। হয়তো মাঝেমধ্যে বিমান হামলার মতো বিষয়ও পাশাপাশি ঘটবে।
আর ঠিক এজন্যই সিরিয়ার দিক হতে Syrian Democratic Forces (SDF) 'কে হয়তো দামেশকের অফেন্সিভ থামাতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে সরে পড়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইরানে থাকা কুর্দিদের সাথে তেহরানের সামরিক বাহিনী ও সরকারের সরাসরি সশস্ত্র সংঘাত রয়েছে। বর্তমান আন্দোলনেও সরাসরি দমন-পীড়নের বড় অংশ চলছে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায়। এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়া ও ইরাকের অভিজ্ঞ কুর্দি গেরিলা এবং সৈনিকদের ইরানের দিকে মোতায়েন করা হলে ইরানকে চূড়ান্ত পর্যায়ে অস্থিতিশীল করে ফেলা অনেকাংশে সম্ভব। আবার সিস্তান-বালুচিস্তানের দিকে সুন্নি জনগোষ্ঠীর ওপর ইরানের দমন-পীড়ন বহু দীর্ঘকাল ধরে চলছে। যেখানে আলোচ্য সুযোগকে কাজে লাগিয়ে Central Intelligence Agency (CIA) একদা পাকিস্তানের Inter Services Intelligence (ISI) 'কে বলেছিল সুন্নিদের নিয়ে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তুলতে। সুতরাং, جيش العدل এর জন্ম হয়। স্বয়ং আমেরিকার Designated Terrorist Organization এই সংগঠনটি বর্তমানে পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স কমিঊনিটির দ্বারা প্রতারিত হয়ে এখন পুরোপুরি বা অনেকখানি Autonomous বলে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন। যদি বর্তমান আন্দোলন এভাবে চলমান থাকে বা বর্তমান আন্দোলন হতে সৃষ্ট পরিবেশও টিকে থাকে, তাহলে এসমস্ত সংগঠন ইরানের মাঝে নিজেদের শক্তি অনেক বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম। যেখানে ইরানকে নিজের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হতে পারে।
সবচেয়ে দূঃখের বিষয় হলো, ঠিক উপরোক্ত পরিস্থিতি ইরান স্বয়ং সাদ্দাম হুসেঈনের ইরাকের জন্য সৃষ্টি করেছিল। সেসময় ইসরায়েল, আমেরিকা, বৃটেন ও ফ্রান্সের সাথে মিলে ওরা ইরাকে সাদ্দাম হুসেঈনের সরকারের ওপর ঠিক অনুরূপ পদ্ধতিতে চাপ সৃষ্টি করে। আজকে যে কুর্দি বাহিনী তেহরানের দিকে ধেয়ে আসবার জন্য জড়ো হচ্ছে বলে আমি অনুমান করছি, ঠিক এই কুর্দিরা তখন ইরানকে নিজেদের পাশে নিয়ে ইরাকের ওপর মার্কিন সামরিক অভিযানের পক্ষে জড়ো হয়েছিল। নর্দার্ন ইরাকে ওদের যে আনকনভেনশনাল ওয়ারফেয়ার বিষয়ক তৎপরতা নিয়ে আমার লেখাও রয়েছে।
সবমিলিয়ে, সমগ্র পরিস্থিতির উপসংহার হলো, ইরানকে এখন 'No longer a threat' পর্যায়ে উন্নীত করার পদক্ষেপ চলছে। আজকের আন্দোলন যদি এমনকি সফলতা নাও পায়, এটার রেশ রয়ে যাবে বলেই আমি মনে করি। ঠিক যেমনটি হয়েছিল ইরাকের সাথে। সাদ্দাম হুসেঈনের বাগদাদ তখন যা করতে বাধ্য হয়েছিল, তেহরানের গতিও আজ সেদিকে। আগেও বলেছিলাম, আজও বলছি, তেহরানকে তাড়া করা হচ্ছে। আর আজ না হোক, কাল না হোক, পরশু তেহরানকে হয়তো ধরে ফেলাই হবে। সেক্ষেত্রে কিভাবে ধরা হবে, তা হয়তো ধরার সময় দেখা যেতে পারে। Friedrich Nietzsche যেমন বলেছিলেন,
If you stare into the abyss long enough, the abyss stares into you right back!
ইরান নিজের স্বার্থোদ্ধারে নৈতিকতার বালাই না রেখে নিজেদের প্রকাশ্য শত্রুদের সাথে মিলে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন গোপন কর্মকাণ্ড করেছে। এখন ইরানের কাছ থেকে আরম্ভ হয়েছে স্বার্থ উদ্ধারের পালা।
ধন্যবাদ।
0 Comments
Thanks you
Emoji